প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে চলছে কার্যক্রম, ভোগান্তিতে সাড়ে তিন লাখ মানুষ
বাঞ্ছারামপুরে ১১ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নেই, ব্যাহত নাগরিক সেবা
বাঞ্ছারামপুরে ১১ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নেই, ব্যাহত নাগরিক সেবা
প্যানেল চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে চলছে কার্যক্রম, ভোগান্তিতে সাড়ে তিন লাখ মানুষ
আলী আহাম্মেদ | বাঞ্ছারামপুর প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টিতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা কার্যক্রম। প্যানেল চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মধ্যে ১১ জন পালিয়ে যান অথবা পদত্যাগ করেন। বর্তমানে শুধু আইয়ুবপুর ও ছয়ফুল্লাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্বপদে বহাল রয়েছেন। ফলে বাকি ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম প্যানেল চেয়ারম্যান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যানশূন্য ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে গিয়ে অনেক সময় প্যানেল চেয়ারম্যান কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যদের পাওয়া যায় না। এতে নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসংক্রান্ত কাজ, ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির মতো সেবা পেতে একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতির কারণে জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা, জবাবদিহি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ায় বাঞ্ছারামপুরের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে পরিষদের কার্যক্রম চালু থাকলেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি, জনসম্পৃক্ততা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক ব্যবস্থা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা
চেয়ারম্যান না থাকায় বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ের গ্রাম আদালতের কার্যক্রম নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্রামাঞ্চলের ছোটখাটো বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ও কম খরচে নিষ্পত্তির সুযোগ থাকলেও সব ইউনিয়নে এ কার্যক্রম সমানভাবে সচল নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফরদাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা প্রবাসী আল-আমিন মিয়া বলেন,
‘এখন ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে আমরা সাধারণ নাগরিকরা বিভিন্ন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ছোটখাটো কাজের জন্যও বারবার ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হয়।’
পাহাড়িয়াকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা কামাল আহমেদ বলেন,
‘আগে ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই চেয়ারম্যান-মেম্বারদের পাওয়া যেত। কোনো সমস্যা হলে সরাসরি কথা বলা যেত। এখন অনেক ক্ষেত্রে কার কাছে গেলে সমস্যার সমাধান হবে, সেটাই বুঝতে পারি না। প্যানেল চেয়ারম্যান বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেন।’
রূপসদী ইউনিয়নের বাসিন্দা গৃহবধূ তানিয়া আক্তার বলেন,
‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে গিয়ে আদালতে মামলা করা গ্রামের মানুষের জন্য সহজ নয়। যাতায়াত, আইনজীবী ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। গ্রাম আদালত ঠিকভাবে কাজ করলে এসব ঝামেলা অনেক কমে। সম্প্রতি আমাকে কয়েকবার জেলায় মামলার কাজে যেতে হয়েছে।’
জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও সেবা সচল রাখার চেষ্টা
জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা ও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-এমরান খান বলেন,
‘চেয়ারম্যান না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান অথবা দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি সদস্যের মাধ্যমে বিভিন্ন নাগরিক সেবা এবং গ্রাম আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জনপ্রতিনিধি সংকটের মধ্যেও অধিকাংশ ইউনিয়নে আদালতের কার্যক্রম চালু রয়েছে।’
স্থানীয়রা বলছেন, গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও কার্যকর করার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের অন্যান্য নাগরিক সেবা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন আরও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ। একই সঙ্গে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাঞ্ছারামপুরের ১১ ইউনিয়নে চেয়ারম্যানশূন্য পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হবে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হবে।

এটিএমটিভি ২৪ 






আপনার মতামত লিখুন