Logo
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬  |  প্রিন্ট: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী তাজমিনের মৃত্যু: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত

এটিএমটিভি ২৪

এটিএমটিভি ২৪

কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী তাজমিনের মৃত্যু: সিসিটিভি ফুটেজে নতুন তথ্য, রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত

আলী আহাম্মেদ | এটিএম টিভি

কুমিল্লার লালমাই উপজেলায় ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ সামনে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনাস্থলে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির সম্ভাব্য চিহ্ন এবং পরিত্যক্ত একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়ার বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাজমিনকে দাফন করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা-বাবা। পরিবারের পাশাপাশি স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারাও এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে একটি বাস থেকে তাজমিনকে নামতে দেখা যায়। বাসটি কক্সবাজার থেকে ফিরছিল।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বাস থেকে নামার পর তাজমিন হোটেলের পাশের খাবারের দোকান এবং পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায়। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে তাকে কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় দোকানিকে তাকে কিছু দেখাতে বা কোনো দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায় বলে ফুটেজ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু দেখার পর তাজমিনকে অন্য পাশে যেতে দেখা যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়।
তবে ওই এলাকা ছাড়ার পর তাজমিন কোন পথে গিয়েছিল, কোথায় গিয়েছিল কিংবা কারও সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার চলাচলের পথ ও সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত করছে।
ঘটনাস্থলে ধস্তাধস্তির চিহ্ন, পাশে অটোরিকশা
ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, জগতপুর গ্রামের নির্জন পাকা সড়কের দুই পাশে কয়েকটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় ছিল। এতে সেখানে দৌড়াদৌড়ি বা ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা।
ধানক্ষেতের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে স্থানীয়রা সেটি টেনে সড়কের ওপর তোলেন। অটোরিকশাটির কিছু দূরে একটি ব্যাগও পড়ে ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন জানান, সকালে ধানক্ষেতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অটোরিকশার কাছাকাছি একটি ব্যাগ দেখতে পান। পরে আশপাশের ধানক্ষেতে এলোমেলো ধানগাছের চিহ্ন অনুসরণ করে সামনে এগিয়ে এক নারীর মরদেহ দেখতে পান। এরপর তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলের অবস্থা দেখে তার ধারণা, সেখানে ধস্তাধস্তি হয়ে থাকতে পারে। তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তবে ঘটনাস্থলের এসব আলামত কী নির্দেশ করে এবং কীভাবে তাজমিনের মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
চার দিন আগে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকত সে। তাজমিন স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
তার বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লায় রেনেটা ওষুধ কোম্পানির আঞ্চলিক পর্যায়ে চাকরি করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় তাজমিন। পরে সে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ সময় তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
বাবার ফোনে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন
তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম জানান, মেয়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ফোন রিসিভ না হওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
তিনি বলেন, বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেয়ের ফোন থেকে একটি মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠানো হয়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। তবে তখন ঘুমিয়ে থাকায় তিনি মেসেজটি দেখতে পারেননি।
সকালে মেসেজ দেখে পাঠানো লোকেশনে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে পান বলে জানান তিনি।
এদিকে তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তাজমিন চঞ্চল স্বভাবের ছিল। পরিবারের প্রতিও তার দায়িত্ববোধ ছিল। তার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
যা বলছে পুলিশ
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, প্রথমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। পরে পরিচয় নিশ্চিত হয়। কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি নিবন্ধিত। অটোরিকশাটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে বলে জানান তিনি।
দ্রুত বিচারের দাবি পরিবারের
জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভ বিরাজ করছে। সিসিটিভি ফুটেজ, অটোরিকশা, ঘটনাস্থলের আলামত এবং তাজমিনের শেষ মুহূর্তের চলাচল বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন—নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিন কোথায় গিয়েছিল, তার সঙ্গে কারও দেখা হয়েছিল কি না এবং জগতপুরের ধানক্ষেতে কীভাবে তার মৃত্যু হলো।
এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।

প্রকাশক : আলী আহাম্মেদ, সম্পাদক : মো: আসাদুজ্জামান

প্রিন্ট করুন