Logo
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬  |  প্রিন্ট: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

বাঞ্ছারামপুরে ৩০ কমিউনিটি ক্লিনিকের ২৬টিই ঝুঁকিপূর্ণ

এটিএমটিভি ২৪

এটিএমটিভি ২৪

বাঞ্ছারামপুরে ৩০ কমিউনিটি ক্লিনিকের ২৬টিই ঝুঁকিপূর্ণ

ভাঙা ভবনে চলছে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও জনবল সংকট

আলী আহাম্মেদ, বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২৫ থেকে ২৬টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। কোথাও ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ভাঙা দরজা-জানালা দিয়ে ঘটছে চুরি। রয়েছে ওষুধের সংকট, বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির অভাব। ব্যবহার অনুপযোগী শৌচাগার আর জরাজীর্ণ পরিবেশে ব্যাহত হচ্ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। এতে উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে অবস্থিত এসব কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই নির্মিত হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও যথাযথ তদারকির অভাবে অনেক ভবন এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে। কোনো কোনো ক্লিনিকে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। এমনকি পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগও রয়েছে।

সদর ইউনিয়নের সদর কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) শিরিন সুলতানা জানান, তাঁর ক্লিনিকে একাধিকবার চুরি ও তালা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ায় রোগীরা ভেতরে ঢুকতে ভয় পান। প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পাঁচ বছর আগেই ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, মনাইখালী কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবন ভেঙে পড়ায় সেখানে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ক্লিনিকের দুরবস্থায় ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরাও। বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমা খাতুন অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে ওষুধ আনতে এসে বলেন, “বাচ্চার জ্বর নিয়ে ওষুধ নিতে এসে ভেতরে ঢুকতেই ভয় লাগে। ছাদ থেকে সিমেন্টের টুকরা খসে পড়ে। আমরা গরিব মানুষ, শহরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। কিন্তু এমন ভাঙা ঘরে চিকিৎসক ও রোগী—দুজনেরই জীবনের ঝুঁকি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, অনেক সময় গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ও প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ পাওয়া যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়।

ছলিমাবাদ ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা আজগর আলী বলেন, বসার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, শৌচাগার নোংরা এবং চিকিৎসক নিয়মিত পাওয়া যায় না। তাঁর অভিযোগ, সপ্তাহে মাত্র এক দিন চিকিৎসক আসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সিএইচসিপি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে গিয়ে তাঁরা সব সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকেন। পরিচ্ছন্নতা, তালা খোলা ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজও তাঁদের সামলাতে হয়। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে রোগীদের অসন্তোষের মুখেও পড়তে হয়।

বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন বর্মন বলেন, উপজেলার ৩০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ২৫ থেকে ২৬টির ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র ও তালিকা পাঠানো হয়েছে।

তিনি জানান, দুটি ক্লিনিকে সিএইচসিপি নেই। ওষুধ ট্রাস্টের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। বরাদ্দের ওষুধ শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী সরবরাহ আসার আগ পর্যন্ত সংকট দেখা দেয়। পর্যায়ক্রমে অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কাজ করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে পরিত্যক্ত ক্লিনিক ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা বসার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

স্থানীয়দের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকাশক : আলী আহাম্মেদ, সম্পাদক : মো: আসাদুজ্জামান

প্রিন্ট করুন