বাঞ্ছারামপুরে একই রাতে তালাক ও বিয়ে, তিন দিন পর আগের স্বামীর ঘরে ফেরানোর অভিযোগ: কাজীর বিরুদ্ধে তদন্ত ও লাইসেন্স বাতিলের দাবি
আলী আহাম্মেদ | বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে একই রাতে তালাক ও অন্যত্র বিয়ে পড়ানো, মাত্র তিন দিন পর আবার আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে। বিয়ে ও তালাকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কাজীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও লাইসেন্স বাতিলের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়দের একাংশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আইয়ূবপুর ইউনিয়নের চর ছয়ানী গ্রামের দুবাইপ্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী রোজিনা বেগমকে কেন্দ্র করে কথিত পরকীয়ার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাতে স্থানীয় মাতব্বরদের উপস্থিতিতে একটি সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নিকাহ রেজিস্ট্রার বিল্লাল হোসেন। সেখানে জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে রোজিনা বেগমের বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর একই রাতে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে পড়ানো হয়। ওই বিয়েতে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কাবিননামায় রবিউল্লাহ ও আলম মিয়া সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন বলে দাবি করেছে স্থানীয় সূত্র।
একই রাতে তালাক ও বিয়ে, তিন দিন পর কীভাবে আগের সংসারে ফেরা?
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ৩ অক্টোবর রোজিনা বেগমকে দ্বিতীয় স্বামীর সংসার থেকে ফিরিয়ে আগের স্বামী জাহাঙ্গীর আলমের ঘরে পাঠানো হয়। তবে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে কী প্রক্রিয়ায় তাঁকে আগের সংসারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার এই অংশ ঘিরেই উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তালাক কার্যকর হওয়ার আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, দ্বিতীয় বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছিল কি না এবং পরবর্তী সময়ে আগের স্বামীর সংসারে ফেরার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন মানা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে তালাকের নোটিশ, কাবিননামা, নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা ছাড়া ঘটনার প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কাজীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অনিয়মের অভিযোগ
কাজী বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অনিয়ম করার অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে কাজীর বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী অনিয়মের অভিযোগগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলামের ভাতিজা জনির মধ্যস্থতায় ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথিত বক্তব্য নিয়ে আলোচনা
এ ঘটনায় বাঞ্ছারামপুর প্রেসক্লাবে কাজী বিল্লাল হোসেনের উপস্থিতি এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন নিয়েও আলোচনা চলছে। অভিযোগে তাঁর নামে একটি বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে—আমি অন্যায় করেছি। আপনারা সাংবাদিকরা আমার ভাই, একটু ম্যানেজ করেন।
বক্তব্যটি সত্যিই তিনি দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, কথোপকথনের প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় বক্তব্যটিকে নিশ্চিত স্বীকারোক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বিয়ে ও তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা, নথিপত্র যাচাই করা এবং সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কাজী বিল্লাল হোসেনের লাইসেন্সের বিষয়ে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে কাজী বিল্লাল হোসেন, রোজিনা বেগম, তাঁর দুই স্বামী এবং অভিযোগে উল্লিখিত অন্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
প্রতিবেদকের বক্তব্য: এ প্রতিবেদন স্থানীয় সূত্রে পাওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ জরুরি। তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।