বাঞ্ছারামপুরে প্রবাসীর ওপর হামলার অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান আঃ আজিজ সহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা
আলী আহাম্মেদ
বাঞ্ছারামপুর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি
১০ আগস্ট ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছলিমাবাদ ইউনিয়নে পূর্ববিরোধের জেরে সৌদি প্রবাসী এক তরুণের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামসহ আটজনের বিরুদ্ধে বাঞ্ছারামপুর মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকেলে ছলিমাবাদ ইউনিয়নের আইডিয়াল প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। হামলায় সৌদি প্রবাসী আলাউদ্দিন মিয়া (২৫) গুরুতর আহত হয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তিনি ছলিমাবাদ ইউনিয়নের মো. কনো মিয়ার ছেলে।
থানায় করা এজাহার, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেলে ছলিমাবাদ ইউনিয়নের আইডিয়াল প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি আলাউদ্দিন মিয়ার ওপর হামলা চালান। এ সময় দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত ও মারধরের পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে নগদ এক লাখ টাকা ও একটি আইফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
হামলার একপর্যায়ে আলাউদ্দিন গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলে মাটিতে পড়ে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
আহত আলাউদ্দিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি একেএম মুছা অভিযোগ করে বলেন, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ ও তাঁর অনুসারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
তিনি বলেন, “আলাউদ্দিন আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে আসছিল। এর মধ্যেই তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর ১০ আগস্ট বাঞ্ছারামপুর মডেল থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামসহ আটজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ছলিমাবাদ ইউনিয়নসহ বাঞ্ছারামপুরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মামলার আসামি বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, হামলার সঙ্গে আমি মোটেও জড়িত নই। আমাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করা হয়েছে। আমার জনপ্রিয়তাকে সবাই ভয় পায়।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ মুঠোফোনে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, তবে আলাউদ্দিন আগে করেছে। আমার লোকজন প্রতিহত করেছে।
অর্থাৎ তিনি হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষ হিসেবে দাবি করেছেন।
আহত আলাউদ্দিন মিয়ার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন।
এদিকে, একই সময়ে ছলিমাবাদ ইউনিয়নে পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে পালানোর সময় সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজুর রহমান আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে দাবি রয়েছে। আহত অবস্থায় তাঁর পায়ে ব্যান্ডেজ করা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ছবিতে তাঁর পায়ে ব্যান্ডেজ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেলেও তিনি কীভাবে ও কোথায় আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন, পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে পালানোর সময় তিনি আহত হন। তবে এ দাবির স্বাধীন বা আনুষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজের নাম এর আগে বাঞ্ছারামপুরের ফরদাবাদ ইউনিয়নের রবির বাজারে এলপিজি গ্যাসের মূল্য নিয়ে ওঠা একটি অভিযোগেও এসেছে।
গত ২৯ জুন কয়েকজন ক্ষুদ্র গ্যাস ব্যবসায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি কথিত সিন্ডিকেট গড়ে এলপিজি গ্যাসের মূল্য নিজেদের ইচ্ছামতো নির্ধারণ এবং অন্য ব্যবসায়ীদের কম দামে গ্যাস বিক্রিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়। অভিযোগপত্রে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, আনাম মিয়া ও শিপনের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
অভিযোগকারী ব্যবসায়ীদের দাবি, কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজারে প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি গ্যাস বাঞ্ছারামপুরের তুলনায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা কম দামে পাওয়া যায়। সেখান থেকে গ্যাস এনে বাঞ্ছারামপুরে বিক্রি করতে গেলে পূর্বহাটি গাবতলী এলাকায় বাধার মুখে পড়তে হয় বলেও তারা অভিযোগ করেন।
তাদের আরও অভিযোগ, গ্যাসবাহী গাড়ি আটকে গালিগালাজ এবং অন্য উপজেলা থেকে গ্যাস বাঞ্ছারামপুরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। দোকানে হামলা ও মালামাল আটকে দেওয়ার ভয় দেখানোর অভিযোগও করেন ব্যবসায়ীরা।
এ অভিযোগের পর গত ৫ জুলাই বিকেলে ফরদাবাদ ইউনিয়নের রবির বাজারে মানববন্ধন করেন স্থানীয় গ্যাস ব্যবসায়ীরা।
মানববন্ধন থেকে ব্যবসায়ীরা কথিত সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান। তারা বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করারও দাবি করেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিমভাবে গ্যাসের দাম বাড়িয়ে রাখার কারণে সাধারণ ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এলপিজি গ্যাসের অভিযোগে নাম থাকা ডিলার ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে ক্যাশ মেমো দেওয়া হয় এবং সেখানে মূল্য উল্লেখ করা থাকে। তবে অনেক দোকানদার ক্যাশ মেমো নিতে আগ্রহী নন।
বাঞ্ছারামপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
পুলিশের তদন্ত শেষে হামলার প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।